Sunday, September 24, 2017

‘রসায়ন’ নবম-দশম শ্রেণি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রসায়ন এর ৬ষ্ঠ অধ্যায়ঃ মোলের ধরানা ও রাসায়সিক গণনা


‘রসায়ন’ নবম-দশম শ্রেণি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রসায়ন এর ৬ষ্ঠ অধ্যায়ঃ মোলের ধরানা ও রাসায়সিক গণনা
মোল(Mole) সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা :
মোল শব্দটি জার্মান Molekul শব্দটির সংক্ষেপিত রূপ,উইলহেম অসওয়াল্ড সর্ব প্রথম এর ধারনা দেন। মোলের সাধারন সঙ্গা হিসেবে বলা যায়, কোন আইসোটোপে তার আনবিক/পারমাণবিক ভরের সমান পদার্থ থাকলে অথবা অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক (6.023E23), যৌগের ক্ষেত্রে অনু ও মৌলের ক্ষেত্রে পরমানু থাকলে তাকে উক্ত পদার্থের এক মোল বলা হয়। সাধারন কথায়, মোল হচ্ছে শুধুই একটা পরিমান। যে পরিমান পদার্থে অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক (6.023E23) অনু, পরমানু, আয়ন ইত্যাদি আছে তাকেই এক মোল বলে। এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, ফরাসী বিজ্ঞানী জ্যাঁ বাপ্তিস্ত প্রথম আবিস্কার করেন পদার্থের আনবিক বা পারমাণবিক ভরে 6.023E23 টি কণিকা থাকে। বিজ্ঞানী অ্যাভোগেড্রোর নামানুসারে তিনি এ সংখ্যার নাম দেন অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা। ধরা যাক, কোন যৌগের আনবিক ভর ১৮ (পানির)। এটা মানে বুঝায় পানির ১৮ গ্রামে বা ০.০১৮ কেজিতে (Kg) অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক (6.023E23 টি) অনু আছে। আবার অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক অনু থাকা মানেই ১ মোল। অর্থাৎ পানির আনবিক ভর মানেই ১ মোল। শুধু পানি নয়, পৃথিবীর তাবৎ অনুর আনবিক ভর সংখ্যার সমপরিমান ভর মানেই ১ মোল। অনুরূপ সোডিয়াম মৌলের পারমানবিক ভর সংখ্যা ২৩ মানে সেখানে অ্যাভোগেড্রো সংখ্যক (6.023E23 টি) পরমানু আছে ও তার পারমানবিক ভর ২৩ গ্রাম-ই হল সোডিয়ামের ১ মোল।

বর্তমানে আয়ন, ইলেক্ট্রন, ফোটন প্রভৃতির ক্ষেত্রেও মোলের প্রয়োগ লক্ষ্যনীয়। যেমন ১ মোল ইলেক্ট্রন বলতে 6.023E23 টি ইলেক্ট্রন বুঝায়। লিথিয়ামের যোজনী ১, তার মানে ১ মোল লিথিয়াম থেকে ১ মোল ইলেক্ট্রন অপসারন করলে ১ মোল তথা 6.023E23 টি লিথিয়াম আয়ন(Li+) পাব। এই এক মোল ইলেক্ট্রন মানেই হল এক ফ্যারাডে বিদ্যুৎ। এখন অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক বন্ধনের ক্ষেত্রেও মোল ব্যবহার করা হয়, যেমন ১ মোল বন্ধন বলতে 6.023E23 টি বন্ধন বুঝায়। 

সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর তড়িৎ বিশ্লেষণ


   ক) ইলেকট্রোপ্লেটিং
   তড়িৎ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সক্রিয় ধাতুর উপর অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় ধাতুর প্রলেপ দেওয়াকে              ইলেকট্রোপ্লেটিং বা তড়িৎ প্রলেপন বলে।

   খ) তড়িৎ রাসায়নিক কোষে লবণসেতু ব্যবহার করা হয় তার কারণঃ
     Ø  লবণ সেতুর মাধ্যমে ২টি অর্ধ-কোষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়।
     Ø  লবণ সেতুর মাধ্যমে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় আয়নের সমতা রক্ষিত হয়।
     Ø  লবণ সেতুর মাধ্যমে কোষ বর্তনী পূর্ণ হয় এবং তড়িৎ চালিত হয়।

    গ) উপরের (i)  নং বিক্রিয়া হতে প্রাপ্ত শক্তি গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।
        উদ্দীপকের (i)  নং বিক্রিয়াটি হচ্ছেঃ
পেট্রোলিয়াম + O2  =   CO2  +  H2O  +  শক্তি
উপরোক্ত সমীকরণ হতে দেখা যায় যে, এখানে পেট্রোলিয়ামে দহন ঘটেছে এবং প্রচুর তাপ শক্তি উৎপন্ন হয়েছে। এই তাপ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে গাড়ি চালানো সম্ভব। কাজ করার ক্ষমতা হল শক্তি। আর জ্বালানি পোড়ালে তাপ উৎপন্ন হয়। আর সেই তাপকে কাজে লাগিয়ে মোটর গাড়ি, রেলগাড়িসহ অন্যান্য তাপীয় ইঞ্জিন চালনা করা যায়।
এখানে পেট্রোলিয়াম এক ধরনের জ্বালানী যার দহনের মাধ্যমে প্রচুর তাপ শক্তি পাওয়া। তাই এই বিক্রয়াটির মাধ্যমে গাড়ি চালানো সম্ভব।

ঘ) তাপশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব। উদ্দীপকে উল্লেখিত সবগুলো বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়েছে। এর মধ্যে (i) নং বিক্রিয়ায় পেট্রোলিয়ামে দহনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়েছে। (ii) নং বিক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামকে  নিউট্রন দ্বারা আঘাত করায় তাপ উৎপন্ন হয়েছে। আর (iii) নং বিক্রিয়ায় তড়িৎ বিশ্লেষনের মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে ।
পারমাণবিক চুল্লীতে 1 মোল ইউরেনিয়াম হতে 2×1013 J তাপ উৎপন্ন হয়। যা অত্যন্ত লাভজনক । কিন্তু পারমাণবিক চুল্লীর সাহায্যে তাপ উৎপাদন খুবই ব্যয় সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ইহা জনবহুল ক্ষুদ্র আয়তনের বাংলাদেশে জন্য মোটেই উপযোগী নয়।
তড়িৎ বিশ্লেষন অর্থাৎ গ্যালভানিক সেলের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ দ্বারা টর্চ জ্বালানো, বাল্ব জ্বালানো, টিভি দেখা ইত্যাদি করা সম্ভব হলেও বড় কোন কাজ করা সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য ইহা অনুপযোগী।
প্রক্ষান্তরে  (i) নং বিক্রিয়ায় পেট্রোলিয়ামে দহনের মাধ্যমে উৎপন্ন তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। বাংলাদেশ মোটামোটি পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি উপযোগী।



সৃজনশীল প্রশ্ন-২ এর উত্তর

ক) ধাতব পরিবাহীঃ যে সকল পদার্থ কঠিন অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহণ করে ধাতব বা ইলেক্ট্রনীয় পরিবাহী বলে।

খ) যে সকল পদার্থ আয়নীত অবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহন করে তাদেরকে তড়িৎ বিশ্লেষ্য বলে। সাধারন পানি  বিদ্যুৎ কুপরিবাহী।এর সাথে অল্প পরিমাণ সালফিউরিক এসিড যোগ করলে ইহা বিদ্যুৎ পরিবহন করে। অ্যানোডে পানির অনু জারিত হয়ে অক্সিজেন গ্যাস, হাইড্রোজেন আয়ন ও ইলেকট্রন উৎপন্ন করে। অপরদিকে ক্যাথোডে হাইড্রোজেন আয়ন বিজারিত হয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। পানির ত্যাগকৃত ইলেকট্রন তার দিয়ে ক্যাথোডে পৌছায়। অর্থাৎ এসিড মিশ্রিত  পানি তড়িৎ বিশ্লেষ্য পরিবাহী।

গ) উপরের কোষে গলিত MgCl2  এর তড়িৎ বিশ্লেষণ দেখানো হয়েছে। বিগলিত MgCl2  এর তড়িৎ বিশ্লেষণ বিক্রিয়ায় Mg+2 এবং Cl- আয়ন পাওয়া যায়।
 

                 
      ক্যাটায়ন                      অ্যানায়ন
        Mg+2                            Cl-
বিদ্যুৎ পরিবহণ করলে অ্যানোড কতৃক ঋণাত্মক  Cl- আয়ন আকৃষ্ট হবে। Cl- আয়ন অ্যানোডে গিয়ে ইলেকট্রন ত্যাগ করে ক্লোরিন গ্যাসে রুপান্তরিত হয়।

               
আবার ক্যাথোড কতৃক ধনাত্মক  Mg+2 আয়ন আকৃষ্ট হবে। Mg+2 আয়ন ক্যাথোডে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক  ইলেকট্রন গ্রহন করে ম্যাগনেসিয়াম ধাতুতে পরিণত হয়


ঘ) উদ্দীপকে একটি তড়িৎ বিশ্লেষণ কোষ দেখানো হয়েছে । উল্লেখিত কোষে বাইরের উৎস থেকে পরিবাহিত বিদ্যুৎ রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত হয়। অনেক রাসায়নিক বিক্রিয়া আছে যেগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে না। এই বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য বিদ্যুৎ প্রবাহের প্রয়োজন হয়।
উদ্দীপকের কোষটিতে বাইরে থেকে বিগলিত  MgCl2 এ নিমজ্জিত তড়িৎদ্বার গুলো ক্যাটায়ন ও অ্যানায়নকে
আকর্ষণ করতে পারে না। ফলে MgCl2 হতে সৃষ্ট Mg+2 ও  Cl- আয়নসমূহ অপরিবর্তিত থেকে যায় এবং কোন
বিক্রিয়া ঘটে না।
প্রক্ষান্তরে উক্ত কোষে  বিদ্যুৎ প্রবাহ চালনা করলে Mg+2 ক্যাথোড কতৃক আকৃষ্ট হবে এবং সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইলেকট্রন গ্রহন করে ম্যাগনেসিয়াম ধাতুতে পরিণত হবে। আবার Cl- আয়ন অ্যানোড কতৃক আকৃষ্ট হবে এবং সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইলেকট্রন ত্যাগ করে ক্লোরিন গ্যাসে পরিণত হয়।
সুতরাং উপরের বিক্রিয়া সংঘটনের জন্য তড়িৎ প্রবাহ একান্ত আবশ্যক।


Saturday, September 23, 2017

কেন বারবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা


একাত্তর সাল। পশ্চিম পাকিস্তানিদের থাবা থেকে নিজেদের মুক্ত করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পাওয়ার জন্য এ দেশের দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। নিয়েছিল গেরিলা ট্রেনিং। ঘরের প্রিয়জনদের মায়া-মমতাকে তুচ্ছ করে শত্রুকে মোকাবিলা করতে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন আধপেট খেয়ে কখনো বা না খেয়ে বন জঙ্গলে কাটিয়েছেন। নয় মাস যুদ্ধ করার পর পেয়েছিলেন লাল-সবুজের একটি পতাকা। বাংলাদেশ নামে একটি দেশ উপহার দিয়েছিলেন তাঁরা।

সেই সোনার ছেলেরা কি তখন কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধে গিয়েছিলেন? যাননি। তাঁরা গিয়েছিলেন নিজেদের একটি পরিচয়ের জন্য। আমাদের একটি মানচিত্র থাকবে, শুধু সেই আশায় গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সেই বীর ছেলেদের দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, যার যার দক্ষতা আর বীরত্বের মাপকাঠিতে।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাঁদের। সম্মান দিয়েছে জাতি। সেই তালিকায় হয়তো অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়েছিলেন। পরবর্তীতে কারো নাম সংযুক্ত হয়েছিল। কেউ বা রয়ে গেছেন তালিকার বাইরেই। কারণ এমন অজপাড়াগাঁয়ে হয়তো তিনি থাকেন, শহরের অনেক খবর সেখানে পৌছেনা।

সবচেয়ে অবাক লাগে, যখন শোনা যায় প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার ধুম পড়ে যায়। সরকার তাদের দলের লোকজনদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য অপতৎপরতা চালায়। দেখা যাকে তালিকাভুক্ত করা হলো সে মুক্তিযুদ্ধেই যায়নি। কিংবা তখন তার বয়স ছিল দশ কি বারো। কখনো আবার আগের সরকারের আমলে করে যাওয়া তালিকা থেকে অনেককেই বাদ দেওয়া হয় শুধু বিরোধিতা করার জন্য। এভাবে দেশে একেকবার সরকার পরিবর্তন হয় আর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাড়তে থাকে, আবার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বাদ পড়ে যায়।
স্বাধীনতার পরে এখন পর্যন্ত ছয়বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা ও মানদণ্ড দশবার পাল্টানো হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩২ হাজার। নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় যুক্ত করার জন্য এখন পর্যন্ত এক লাখ সুপারিশ পেয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল। গত ২১ জানুয়ারি প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শুরু হয়।
এখন জনমনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কারা যাচাই-বাছাই করে এই নতুন নাম পাঠাল? মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার স্থানীয় সাংসদদের নেতৃত্বে উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়েছে। তাঁরাই তাঁদের পছন্দমতো নামের সুপারিশ করেছেন। অভিযোগ পাওয়া গেছে কোনো কোনো এলাকায় মন্ত্রী ও সাংসদদের প্রভাব খাটানোর বিষয়টি। সবচেয়ে অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হচ্ছে, অর্থের বিনিময়েও তালিকাভুক্তির জন্য নাম পাঠানো হয়েছে। কোথাও কোথাও এমনও হয়েছে, স্থানীয় সাংসদ ঢাকায় থাকেন, কিন্তু তাঁর পছন্দের একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর জেলা বা উপজেলার নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পাঠানোর জন্য। এখানেই শেষ না, সেই পছন্দের ব্যক্তিটিও ঢাকায় থাকেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কেন এই নাম ওঠানোর প্রতিযোগিতা? কিসের লোভে? এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মুনতাসীর মামুন যথার্থই বলেছেন, ‘সরকার যদি এখন ঘোষণা দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে না, তা হলে কাল থেকে কেউ আর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম তুলতে চাইবেন না।’
তিনি আরো বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা কেন এই সুবিধা পাবেন? এসব বন্ধ করা উচিত। আর কোনো তালিকা করা উচিত হবে না।
মুনতাসীর মামুন মনে করেন, এখন যা হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থেই হচ্ছে।
আমাদের এই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বাড়ানো বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে কোনো কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ কবে হবে? কেন যাচাই-বাছাই কমিটিকে পাঁচ কোটি টাকা সম্মানী ও খরচ দেওয়া হবে? জানা গেছে, এবার যে সাংসদদের নেতৃত্বে উপজেলা, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়েছে, তাদের জন্য এই পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এই টাকা কার? জনগণেরই তো, নাকি?

মহান ত্যাগের বিনিময়ে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধার খেতাব পেয়েছেন বা পাননি, আমরা তাঁদের আর অপমান করতে চাই না। তাঁদের দোহাই দিয়ে যাঁরা নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন, বাড়ি-গাড়ি করছেন, তাঁদের জানাই ধিক্কার। তাঁদের লজ্জা থাকা উচিত, এখনো এই বাংলাদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বয়সের ভারে কাবু হয়ে গেছেন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিয়ে কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। আর আপনারা মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেরই জন্মই হয়তো হয়নি, বা মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগকে বোঝার মতো বোধশক্তিই হয়নি, তাঁরা এই বিশাল কাজ করে সরকারি টাকা নিচ্ছেন, তাঁদের একটু লজ্জা থাকা উচিত।
সবশেষে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে বলব, মুক্তিযুদ্ধের মতো পবিত্র বিষয়টিকে নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা যাতে না হয়, সেদিক নজর রাখা দরকার।

২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে


আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত ৭টি কলেজের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।  পরীক্ষাটি ১ নভেম্বর বুধবার নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়াও পূর্বে পরিবর্তিত তারিখ অনুযায়ী গণিত পরীক্ষা আগামী ৩১ অক্টোবর মঙ্গলবার যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ শনিবার এ কথা জানায়। -বাসস

সুচি কে লেখা শিশু রোহিঙ্গা জহিরের মর্মস্পর্শী চিঠি


প্রিয় অং সান সু চি,

আপনি কি ভাল আছেন? হয়তো ভাল। আবার না ও থাকতে পারেন। কারণ যতদূর জানি আপনার স্বভাব কিছুটা আমার মায়ের মতনই। আপনি দেখতেও আমার মায়ের মতনই কিছুটা। তাই আপনাকেই কিছু কথা বলতে চাই। যেহেতু মায়ের কথা খুব মনে পরছে এ মুহূর্তে। সে যেখানেই থাকুক, আল্লাহ ভাল রাখুন তাঁকে।

আচ্ছা, নিজের পরিচয় দেই একটু। আমার নাম জহির, বয়স ১২। বাবার নাম বসির উদ্দিন। মা তাহেরা। আমার আরও তিনটি ভাই বোন আছে। কিন্ত তারা আজ কে কোথায় আছে আমি তা জানিনা। আমাদের আপনারা রোহিঙ্গা বলে ডাকেন – মুসলিম রোহিঙ্গা, হিন্দু রোহিঙ্গা। আমাদের রাখাইন রাজ্যের গাঁয়ে আমরা ভালো ছিলাম কি মন্দ ছিলাম জানিনা, তবে আজকের চেয়ে অবশ্যই ভালো ছিলাম। আজ শুধু বেঁচে আছি, যদি একে বাঁচা বলে। এইটুকু বয়সে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আজ সে কথাই আপনাকে বলতে চাই। আরও বলতে চাই একটি স্বপ্নের কথা। আমার এখন একটাই স্বপ্ন। আর তা হল আপনার সাথে দেখা করা। দেখা হলে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব। এবং অবশ্যই তার উত্তর নিয়েই আমাকে ফিরতে হবে।

আমার বাবা ছিলেন জেলে। মাছ ধরে খুব অল্প রোজগারে আমরা প্রতিদিন খেতে আর পরতে পারতাম। আমাদের গাঁয়ে একটা স্কুল ছিল। সেখানে আমি প্রতিদিন পড়তে যেতাম। বইয়ের পাতার জগৎটা আমার কাছে অদ্ভুত, অপরিচিত তবে রঙ্গিন আর স্বপ্নের মতই মনে হত। কল্পনায় দেখতাম আমিও একদিন দেশের নাম বলবো, পতাকা আঁকবো আর গাইবো জাতীয় সংগীত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গায়ের গণ্ডী ছাড়িয়ে যাবো রাজধানীতে। যদিও বইয়ের পাতায় যে দেশ, প্রকৃতি, গল্প, কবিতা, ইতিহাস লেখা ছিল তার সাথে আমাদের জীবনের কোন মিল ছিল না। আমি জানতাম না দেশ কী, পতাকা কী, সেনাবাহিনী কী। কিন্তু এ কদিনে এবং আজ জীবন আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে।

প্রথম কষ্টের দিন শুরু হল যেদিন আমার বাবা তার রক্তাক্ত আর ব্যান্ডেজ করা মাথা নিয়ে নদী থেকে ফিরে এলেন। কারণ আপনার সেনারা বলল নদীতে মাছ ধরা নাকি রোহিঙ্গাদের জন্য নিষেধ।তারা সব জেলেকে মেরে পিটিয়ে নদী থেকে তাড়িয়ে দিল। আল্লাহ’র দুনিয়ায় নিজের গাঁয়ের নদীতে মাছ ধরা কোন ধরণের অপরাধ ছিল একটু বুঝিয়ে বলবেন আমাকে?

তারপর বাবা আমাদের মুখে একটু অন্ন যোগানোর জন্য হেন কাজ নেই যা করেননি। কুলির কাজ করা, জুতা সেলাই করা থেকে শুরু করে আরও কত কাজ। এখানে যেকোন কাজ পাওয়াই কঠিন। আমার বাবা পরিশ্রমী একজন মানুষ ছিলেন। কখনও বসে থাকতেন না। সর্বশেষ আমি ও বাবা একজনের জমিতে কাজ নিয়েছিলাম। বর্গা চাষির কাজ। স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম আবার, দিন ফিরবে। আমরা খুবই সাধারণ শ্রমিক রোহিঙ্গা। রাজনীতি বুঝিনা। শুধু খেয়ে পরে বাঁচতে চাই। আমাদের তো খুব বেশি চাওয়া কোনকালেই ছিল না। তাই পরিশ্রম করে দিন ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখা কি অপরাধ ছিল?

কিন্তু হঠাৎ সে স্বপ্নেও ছেদ পরল। সেদিন সবে সন্ধ্যা হয় হয়। বেশ কিছু সেনাসদস্য কয়েকটা গাড়িতে করে এলো। কিছু লোক এলো সাধারণ পোষাকে। তারা চিৎকার করতে করতে ঘৃণিত দৃষ্টি নিয়ে আমাদের গায়ে ঢুকে পরল। কথা নেই বার্তা নেই গুলি করতে লাগল। আমার সামনেই আমার বাবাকে দেখলাম গুলি খেয়ে পরে যেতে। আমি তাকে ধরতে যেতেই হ্যাঁচকা টানে কে যেন আমাকে ঘরের পিছনে আড়ালে নিয়ে গেল। সেখানে আমার ভাইবোন আর মা ও ছিল। সারা গাঁয়ে শোরগোল পরে গেল। তার মাঝেই বুঝলাম কে বা কারা আমাদের ছোট্ট ঘরটিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুনের দাউ দাউ আভায় দেখলাম সন্ধ্যা নেমেছে পুরোপুরি। আর পুড়ে যাচ্ছে আমাদের ঘর, পুরে যাচ্ছে আমাদের সব স্বপ্ন। আমরা ঊর্ধ্ব শ্বাসে প্রাণ নিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ পারলাম না। মস্ত ইউনিফরম পরা ভয়ংকর চেহারার এক লোক, আমার মাকে, যে আমার ছোট বোনটিকে নিয়ে দৌড়াতে পারছিল না, ধরে ফেলল। ছোট্ট বোনটিকে সে ছুড়ে দিল মাটিতে। ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগল মাকে। আমি চিৎকার করে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ধস্তাধস্তিতে সে আমাকে গুলি করতে না পেরে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করল। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরে এলে দেখি কেউ কোথাও নেই। বাকি তিন ভাইবোনকে খুঁজে পেলাম না কোথাও। একটু দূরে ঝোপের আড়ালে খুঁজে পেলাম মায়ের গুলিবিদ্ধ উলঙ্গ দেহখানি। এমন দৃশ্য এর আগে কোনদিন দেখিনি আমি। দু:স্বপ্নের চেয়েও ভয়ংকর। পাগলের মত কাঁদতে লাগলাম আমি। এই ভয়ংকর দৃশ্য কেন কিভাবে এলো আমার সামনে?যে মায়ের দুধ আমি পান করেছি, তার নগ্ন দেহ কেন আজ আল্লাহ আমাকে এভাবে দেখাল?

সেই বিশাল প্রান্তর আর জঙ্গলের ধারে এই নগ্ন দেহকে আমি কিভাবে রক্ষা করবো শেয়াল-কুকুরের হাত থেকে? আল্লাহ সহায়। রাস্তা ধরে যাচ্ছিলো শত শত লোক তখন।আসলে পালাচ্ছিল রাতের আঁধারে। তাদের সাহায্য নিয়ে মায়ের দেহখানি মাটিতে পুতে দিলাম দোয়া পড়তে পড়তে। মানুষের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি আমার মা, শেয়াল-কুকুরের হাত থেকে অন্তত বাঁচুক।

হ্যাঁ, বলছিলাম আজ আমি অনেক শক্ত। শুধু কান্না পায় যখন মায়ের কথা মনে পরে। এই শরণার্থী ক্যাম্পের কাছের দোকানের টিভিতে আপনাকে দেখে মায়ের কথা আবার মনে পরল।